শীতকাল সেরা মৌসুমগুলোর একটি হলেও এর কিছু নেতিবাচক দিকও আছে।
যেমনটা অন্যান্য মৌসুমেরও আছে। যেমন, গরমকালে তাপমাত্রা খুব বেশি বেড়ে গেলে অনেকেই পানিশুন্যতা এবং হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তেমনি বর্ষাকালে নানা বায়ু এবং পানিবাহিত ভাইরাল রোগ আক্রমণ করে।
যার ফলে ফ্লু এবং এই জাতীয় অন্যান্য রোগ হয়।
শীতকালে তাপমাত্রা কম থাকার কারণে আপনার দেহকে অতিরিক্ত তাপ উৎপাদন করার জন্য বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে আসে। আপনার দেহকে যেহেতু অতিরিক্ত তাপ উৎপাদনে করতে গিয়ে অতিরিক্ত শক্তি ব্যয় করতে হয় সেহেতু এই সময়ে আপনি নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। শীতকালের সচরাচর রোগগুলো হলো, ঠাণ্ডা-সর্দি, ভাইরাল ফ্লু, শ্বাসকষ্ট, কফ এবং অন্যান্য ইনফেকশন।
নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগও এসময় মানুষকে আক্রান্ত করে। বিশেষ করে যেখানে তাপমাত্রা খুব বেশি কমে যায়। শীতকালে সাইনুসাইটিস এবং অ্যাজমার মতো রোগও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এছাড়া জয়েন্ট পেইন এবং আথ্রাইটিস এর মতো রোগও আরো জোরালো হতে পারে। কেননা শীতকালে ঠাণ্ডার কারণে জয়েন্টে রক্তপ্রবাহের গতি ধীর হয়ে আসে এবং ব্যথা বাড়ে।
কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো শীতকালে খেলে শরীর চাঙ্গা থাকে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আসুন জেনেও নেওয়া যাক..
১. ঘি
যদিও অনেকেই মনে করেন ঘি খেলে মুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে তথাপি সীমিত পরিমাণে ঘি খেলে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে শীতকালে ঘি দেহের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কারণ ঘি-তে আছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড।
২. মাখন
সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর খাবারগুলোর একটি মাখন। এতে আছে উচ্চমাত্রার ক্যালোরি এবং চর্বি। শীতকালে সামান্য পরিমাণে মাখন খেলে দেহের তাপমাত্রা ঠিক থাকে।
৩. টমেটো
একবাটি ধোঁয়া ওঠা টমেটো স্যুপ বা সুরুয়া খেলে শীতকালে আপনি দারুন উপকার পাবেন। টমেটোতে আছে ভিটামিন সি এবং লাইকোপেন উপাদান যা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে তুলবে এবং শীতকালীন রোগ-বালাই থেকে মুক্ত রাখবে।
৪. সবুজ শাক-সবজি
বছরের যে কোনো সময়ই সবুজ শাক-সবজি খাওয়া ভালো। তবে শীতকালে দেহের তাপমাত্রা বাড়াতে এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতোকে শক্তিশালী করতে সবুজ শাক-সবজি বেশ কার্যকর।
৫. কাজু বাদাম
এই বাদাম খুবই স্বাস্থ্যকর। খাবারের স্বাদ বাড়াতে এই বাদাম ব্যবহৃত হয়। প্রতিদিন এক মুঠো বাদাম খেলে হৃদরোগ এবং মানসিক অবসাদের মতো সমস্যা প্রতিরোধ হয়। তবে কাজু বাদাম আপনার দেহের তাপমাত্রা বাড়াতে এবং শীতকালে আপনাকে সুস্থ রাখতেও বেশ কার্যকর।
৬. গোল মরিচ
শীতকালে খাবারের সঙ্গে গোলমরিচ দিলে রোগ-বালাই দূরে রাখে। কালো গোল মরিচে আছে প্রদাহরোধী উপাদান যা নানা ধরনের শীতকালীন রোগের চিকিৎসায় বেশ কার্যকর। যেমন শ্বাসকষ্ট, ঠাণ্ডা-সর্দি, কফ এবং জয়েন্ট পেইন।
৭. আপেল
শীতকালে আপেলের উৎপাদন হয় বেশি। এই সুস্বাদু ফলটিতে আছে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, নানা ধরনের ভিটামিন এবং খনিজ পুষ্টি। এসব উপাদান হজম ক্ষমতা বাড়ানোর পাশপাশি রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে।
৮. ডার্ক চকোলেট
ডার্ক কোকোয়া পাউডার থেকে তৈরি এক গ্লাস গরম চকোলেট খেতে পারলে শীতকালে আপনার বিপাকীয় প্রক্রিয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এবং দেহের তাপমাত্রাও বাড়াবে। প্রতিদিন আপনি এক টুকরো খাঁটি ডার্ক চিনিহীন চকোলেটও খেতে পারেন।
৯. খেজুর
শীতকালে আপনাকে ভেতর থেকে গরম রাখতে খেজুরের জুড়ি মেলা ভার। এই সুস্বাদু এবং উচ্চ পুষ্টিকর খাবারটি বছরের যে কোনো সময়ই খেলে স্বাস্থ্য চাঙ্গা থাকে।
===
রসুনের গুণ ভালো করে জানুন
সুস্থ থাকতে রসুন খান
রসুন আমাদের দৈনন্দিন খাবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এই রসুনে রয়েছে থিয়ামিন (ভিটামিন বি১), রিবোফ্লাবিন (ভিটামিন বি২), নায়াসিন (ভিটামিন বি৩), প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (ভিটামিন বি৫), ভিটামিন বি৬, ফোলেট (ভিটামিন বি৯) ও সেলেনিয়াম। সেলেনিয়াম ক্যানসার প্রতিরোধে দারুণ কাজ করে। রসুনের মধ্যে রয়েছে এলিসিন নামে এক জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা ক্যানসারসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দূর করতে কার্যকর। এই এলিসিন নামে যে কম্পাউন্ড রসুনে পাওয়া যায়, তার কারণে রসুনকে সুপারফুডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এলিসিন নামক উপাদান থাকার কারণে রসুনকে সুপারফুডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে জানতে পারবেন, তখন রসুন কিন্তু শুধু বিভিন্ন অসুখ সারানোর জন্যই ব্যবহার হতো। মিসরীয়, ব্যাবিলনীয়, গ্রিক, রোমান ও চৈনিক সভ্যতায় ওষুধ হিসেবে রসুন ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এমনকি সকালে খালি পেটে রসুন চিবানোও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি
রসুনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণ একে অনেকটা ওষুধের মতোই তৈরি করেছে, যার দরুন রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। খালি পেটে রসুন খেলে এই উপকার বেশি। বর্তমানে এই অতিমারি পরিস্থিতিতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুব জরুরি, তাই প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খেতে পারেন। খালি পেটে রসুন খেলে প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
রক্ত সঞ্চালনক্ষমতা বাড়ায়
প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেলে রক্ত সঞ্চালনক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যার দরুণ রক্ত বাধাগ্রস্ত হয়ে যেসব রোগের সৃষ্টি করে, তা আর হতে পারে না।
পুরুষের যৌনক্ষমতা বাড়াতেও বেশ সহায়ক
পুরুষের যৌনক্ষমতা নানান কারণে কমে যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেলে ধীরে ধীরে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে দুই ধরনের মতামত থাকলেও পুরুষের ক্ষমতার মূল উৎস হচ্ছে রক্তের সাবলীল গতি। রসুনে এই কাজ করে বলেই যৌনক্ষমতার কথা বলা হয়ে থাকে।
হৃৎপিণ্ডের শক্তিবর্ধক
যাঁরা হৃদপিণ্ডের ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে বিব্রত আছেন, মাঝেমধ্যে বুকের বাঁ পাশে ব্যথা অনুভূত হয়, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হয়, তাঁদের জন্য প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন পানি দিয়ে গিলে খেয়ে ফেলতে হবে, এতে করে হৃদপিণ্ড শক্তিশালী হবে, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির কারণে হৃদপিণ্ডের ব্লকগুলো আর বাড়বে না এবং ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারবে না, বুকের ব্যথা কমে যাবে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হবে না।
উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে
উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য অনেক পথ্যের অন্যতম রসুন। শরীরের এলডিএল বেড়ে যাওয়ার কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায়, প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন সকালে খালি পেটে খেলে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা থাকবে না।
রসুন উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
সংক্রমণ প্রতিরোধে
মানুষের শরীরে যেকোনো সময়ে সংক্রমণ ঘটতে পারে। সংক্রামক রোগ এমন একটি অবস্থা, যার কোনো পূর্বলক্ষণ থাকে না। প্রতিদিন সকালে খালি পেটে দুই কোয়া রসুন খেলে শরীর সংক্রমণ প্রতিরোধ করে।
ফুসফুসের সংক্রমণ প্রতিরোধে
ফুসফুসে বিভিন্ন কারণে সংক্রমণ হতে পারে। অ্যালার্জি সমস্যা, ঠান্ডা লাগার প্রবণতা থেকে ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটতে পারে, যা থেকে মুক্তি পেতে রসুন পিষে রস খেলে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে, সঙ্গে হলুদগুঁড়া গরম পানি দিয়ে চায়ের মতো খেলে সংক্রমণ থাকে না। আর প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খাওয়া ফুসফুসের সংক্রমণ রোধে অত্যন্ত কার্যকর।
রক্ত পরিশোধিত করে
প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খেলে রক্তের পরিশোধনক্ষমতা বেড়ে গিয়ে রক্ত চলাচলে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসে, তাতে শরীর ভালো থাকে, নিরোগ দেহের জন্য সাবলীল রক্ত চলাচল অত্যন্ত কার্যকর একটি উপায়।
ত্বক ভালো রাখে
প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন খালি পেটে খেলে ত্বক ভালো থাকে, ত্বকে বার্ধ্যকের ছাপ পড়ে না, চেহারায় কোনো দাগ থাকলে কমে যায়। রসুন ত্বক ভালো রাখতে সহায়তা করে
শরীরে অবাঞ্ছিত ফোলা বা গোটা
অনেকের শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ফোলা পিণ্ড থাকে, বাড়ে কমে না, ব্যথাও করে না, কিন্তু ফোলাটা মিশেও না, এমন ফোলা বা গোটা শরীর থেকে মুছে ফেলতে প্রতিদিন ছয়-আট কোষ রসুন সকালে খালি পেটে এবং দুপুর ও রাতে খাবার পর দুইটি করে রসুন কোষ খেলে ফোলাটা ধীরে ধীরে মিশে যাবে। অথবা দুই কোয়া রসুন হালকা করে ভেজে তা খেতে হবে।
সেল ড্যামেজ রোধ করে
রসুনে উপস্থিত অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট ‘সেল ড্যামেজ’ ও ‘এজিং’ রোধ করে। ব্রেনের সেল ড্যামেজ কম হয়ে আলঝেইমারস ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
হাড়ের শক্তি বাড়ায়
একটা বয়সের পর বিভিন্ন কারণে নারীদের হাড়ের শক্তি কমে যায়। প্রতিদিন ২ গ্রাম করে রসুন খেলে নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রায় ভারসাম্য থাকে, যাঁদের কম থাকে, তাঁদের কিছুটা বাড়ে। ফলে হাড়সংক্রান্ত সমস্যা অনেকটা কমে যায়। এমনকি যে নারীদের মেনোপোজ হয়ে গেছে, তাঁরাও নিয়মিত রসুন খেলে অনেক উপকার পাবেন।
রান্নায় রসুনের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ
রসুনের বিভিন্ন ডোজ হয়ে থাকে, রান্নায় ও নানা ভর্তায় রসুনের উপস্থিতি থাকে। রসুনের গুণ পেতে সকালে খালি পেটে খাওয়া উত্তম, আমাদের গ্রামবাংলায় রসুন–মুড়ি খাওয়ার একটা প্রবণতা আছে, এতে কিছু উপকার হলেও বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় কিছু ভালো ফল পাওয়া গেলেও সব ঔষধি গুণ পাওয়া যাবে না।
অনেকের ধারণা, অ্যাজমার জন্যও রসুন উপকারী, কিন্তু ব্যাপারটা ভিন্ন, এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল সক্রিয়ভাবে কাজ করে কিন্তু অ্যালার্জিক অ্যাজমা থাকলে রসুন অ্যালার্জি বাড়াতে পারে কারও কারও ক্ষেত্রে। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে রসুন এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শই দেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকের রসুনে অ্যালার্জি হয়ে থাকে, আর নিয়মিত এটি খেলে যদি কোনো অসুবিধা বোধ করেন, তখন রসুন না খাওয়াই ভালো, তবে স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি এটি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। অনেক ধরনের রসুন বাজারে পাবেন, তার মধ্যে দেশি এককোষী রসুন সবচেয়ে ভালো।
===
No comments:
Post a Comment